ঈমান মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর তা কেবলই আল্লাহ তাআলার দান। এ সৌভাগ্য কেবল তাদেরই লাভ হয়, যাদের হৃদয় ও জবান পবিত্র এবং সত্য বরণ করতে যাদের হৃদয় অনুসন্ধিৎসু। কতই না সৌভাগ্যবান তারা, যাদের কপোলে ঈমানের দৌলত নসিব হয়েছে! আর কতই না দুর্ভাগা তারা, যারা এই অমূল্য দৌলত থেকে বঞ্চিত হয়েছে!
মূলত যার অন্তরে আল্লাহর সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা, শর্তহীন ভক্তি রয়েছে, সে ‘সৃষ্টির সর্বোৎকৃষ্ট জীবে’র মর্যাদায় পৌঁছতে পেরেছে। ঈমান এমন ব্যক্তির অন্তরেই তরতাজা হয়ে জাগ্রত থাকে। কিন্তু যার অন্তর হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য কারও ভক্তিতে নিয়োজিত হয়েছে, সে ‘সৃষ্টির সর্বনিকৃষ্ট জীবে’ পরিণত হয়ে ধ্বংসের অতল গহŸরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং ঈমানের মহামূল্যবান সম্পদ থেকেও চিরবঞ্চিত। এ কারণেই আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় সৃষ্টি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সীমাহীন ও শর্তহীন ভালোবাসার জন্য হযরত আবু বকর রাযি. ‘চিরসত্যবাদীর’ মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন। আর তাঁকে অবমাননাকারী আবু জাহেলো চির-অভিশপ্তদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
কাদিয়ানীধর্ম ইসলামের সাথে এক সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। পরিকল্পিতভাবে ইসলাম ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে অবমাননার ওপর এই ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে, যাতে নবীর সাথে মুসলমানদের গভীর সম্পর্ক দুর্বল করে দেওয়া যায়।

কবি আল্লামা ইকবাল হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কাদিয়ানীদের কুফুরী, বেআদবীমূলক ও অমর্যাদাকর আচরণ সম্পর্কে লেখেন :
“কাদিয়ানীদের কর্মপন্থা ও ইসলাম সম্পর্কে তাদের আচার-আচরণ ভুলে থাকা উচিত হবে না। কাদিয়ানীধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ইসলাম ধর্মকে নষ্ট, পচা দুধের সাথে তুলনা করেছেন আর নিজের মতবাদকে তাজা দুধের সাথে তুলনা করেছেন। নিজের অনুসারীদের ইসলামের অনুসারীদের থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া ইসলামের মৌলিক বিষয় ‘খতমে নবুওয়ত’ অস্বীকার, নিজের মতবাদকে ‘আহমদী’ হিসেবে নতুন নামকরণ, মুসলমানদের পেছনে নামাজ আদায় নিষিদ্ধকরণ, বিবাহ-শাদি সম্পর্ক করা নিষিদ্ধকরণ, সবচেয়ে বড় কথা হলো, গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের কাফের আখ্যায়িতকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রমাণ করে, কাদিয়ানীরা একটি ভিন্নধর্মের অনুসারী। বরং শিখ ও হিন্দুদের মধ্যে যেমন ভিন্নতা ও পার্থক্য রয়েছে, ইসলাম ও কাদিয়ানীদের মধ্যে তার চেয়েও বেশি ভিন্নতা ও পার্থক্য আছে। কারণ শিখ ও হিন্দুদের মধ্যে পারস্পরিক বিবাহ বৈধ।”
“একটি ধর্মীয় মতবাদের আসল চেহারা একদিনে প্রকাশিত হয় না, বছরের পর বছর সময় লাগে। কাদিয়ানীদের দুই গ্রæপ, কাদিয়ানী গ্রæপ ও লাহোরী গ্রæপের মধ্যকার বিবাদ সাক্ষ্য দেয় যে, যারা মির্যা কাদিয়ানীর সঙ্গী ছিল তারাও জানত না তাদের মতাদর্শের চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায়? আমি ব্যক্তিগতভাবে কাদিয়ানীদের প্রতি ক্ষুব্ধ হলাম- যখন দেখলাম, একজন নতুন নবীকে ইসলামের নবী থেকেও বেশি মর্যাদার দাবি করা হচ্ছে এবং সারা দুনিয়ার মুসলমানদের কাফের বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। যখন আমি নিজ কানে কাদিয়ানীদের একজন শীর্ষ ব্যক্তির মুখ থেকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য শুনলাম তখনই বিদ্রোহ করলাম। ‘বৃক্ষের পরিচয় ফলে, শিকড়ে নয়’।”

কাদিয়ানীদের কুফরি বিশ্বাসসমূহের কারণে পাকিস্তানের নির্বাচিত সংসদ তাদের দু’গ্রæপের নেতৃবৃন্দের জবানবন্দি গ্রহণের পর ঐক্যবদ্ধভাবে তাদেরকে অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণা করেছে। ১৯৯৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের ফুল ব্যাঞ্চ ঐক্যবদ্ধভাবে কাদিয়ানীদের সম্পর্কে রায় ঘোষণা করেছেন :
“প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যকীয় হলো, সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিজের জীবন, নিজের সন্তানদের জীবন, পরিবার-পরিজন, পিতা-মাতা ও দুনিয়ার সমস্ত প্রিয় বস্তু থেকেও বেশি ভালবাসবে।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান, বাবু হুব্বির রাসূল মিনাল ঈমান)
সুতরাং কোনো মুসলমান যদি এমন অমর্যাদাকর বক্তব্য শোনে, যা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী করেছে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পাওে, তাহলে তাকে কি অভিযুক্ত করা যাবে?
(এস. সি. এম. আর. আগস্ট ১৯৯৩)

১৯৯৭ সালে প্রকাশিত আমার রচিত কিতাব ‘ছুবুত হাযির হে’-এর শুরুতে দুনিয়ার সমস্ত কাদিয়ানীদের চ্যালেঞ্জ দিয়ে লিখেছিলাম :
“এই কিতাবে কাদিয়ানীদের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, তার ছেলে, তার নামধারী খলিফা ও অন্যান্য কাদিয়ানীদের মূল রচনা ও তাদের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত আপত্তিকর ও কুফুরি বক্তব্যসমূহের স্ক্রিনশট উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের কুফুরি বক্তব্যসমূহের এই প্রমাণগুলো এতটাই সুস্পষ্ট, পৃথিবীর কোনো আদালতে এগুলোর সত্যতা নিয়ে কোনো কাদিয়ানী চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। এই কিতাবে উল্লিখিত সমস্ত উদ্ধৃতি ও স্ক্রিনশটগুলোর সত্যতার দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করছি এবং কাদিয়ানীদের নেতা মির্যা তাহের এবং পৃথিবীর সমস্ত কাদিয়ানীকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, যদি এই কিতাবে উল্লিখিত একটি উদ্ধৃতি বা স্ক্রিনশট মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে এর জন্য যে কোনো শাস্তি আমরা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। পৃথিবীতে কোনো কাদিয়ানী কি আছে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে?”
আল্লাহর অনুগ্রহে আজ পর্যন্ত কোনো কাদিয়ানীদের নেতা মির্যা মাসরূর থেকে নিয়ে কোনো কাদিয়ানী তাদের এসব কুফুরী বক্তব্যসমূহের ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ করেনি। এটি তাদের স্বীকার করে নেওয়া বৈ কি।
কিন্তু আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, এই কিতাব পড়ে অনেক কাদিয়ানী তাওবা করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি যে, যে উদ্দেশ্যে এই কিতাব রচিত হয়েছিল তা পূর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আরও বেশি কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাছীর রহ. ‘যাদুকরগণ সিজদায় লুটিয়ে পড়ল’ (সূরা : শুআরা, আয়াত : ৪৬)Ñ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, ফেরাউনের যাদুকররা মুসা আ.-এর মোকাবেলার জন্য এসেছিল। কিন্তু মূসা আ.-এর মুজিজা দেখে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। আর সিজদা থেকে তখনই মাথা উঠাল, যখন তারা নিজ চোখে জান্নাত, জাহান্নাম দেখতে পেল। তারা খুশিমনে মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত হয়েছিল। কারণ তারা যখন স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছে, দুনিয়ার যে কোনো শাস্তি তাদের কাছে ক্ষুদ্র মনে হয়েছিল।

মুফাসসিরগণ এ-ও লিখেছেন, যাদুকরগণ মূসা আ.-কে সম্মান করে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, আপনি আগে মুজিজা দেখাবেন নাকি আমরা আগে রশি নিক্ষেপ করব? এই আদব-ভদ্রতার কারণে তাদের ঈমানের দৌলত ভাগ্যে জুটেছিল। কিন্তু যেহেতু তারা নবীর মোকাবেলার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছিল, তাই এর শাস্তি হিসেবে তাদের হাত ও পা কাটা গেছে।

কাদিয়ানীরা যেহেতু নবীর সাথে অনবরত বেআদবী ও অবমাননাকর আচরণ করেছে, এর শাস্তি হিসেবে তাদের ঈমানের নূর ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা চির-অভিশপ্তদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু কিছু শুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী মানুষ যারা কাদিয়ানীদের আসল চেহারা চিনত না, যারা প্রতারণার শিকার হয়ে কাদিয়ানীদের জালে ফেঁসে গিয়েছিল। পরে তাদের জীবনচরিত দেখে, তাদের কুফরী বক্তব্যগুলো দেখে, তাদের জীবনাচার মুসলমান সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখে তাদের অন্তরে পেরেশানি সৃষ্টি হয়। তারা বিবেক দিয়ে ভাবতে শুরু করে, দিন-রাত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, রোনাজারি করে, সত্যের সন্ধানে ব্যাকুল এই মানুষগুলোর চোখের পানিকে আল্লাহ তাআলা মণি-মুক্তার মতো দামি বানিয়ে তাদের ঈমানের নূর নসিব করেন। তারা আবার তাওবা করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে ফিরে আসেন।

এই কিতাবটি এমনই কিছু সৌভাগ্যবান ভাইদের ঈমানদীপ্ত দাস্তান, যারা কাদিয়ানীধর্ম থেকে তাওবা করে ইসলাম গ্রহণ করে ঈমানের নূরে আলোকিত হয়েছেন। তারা যেসব অবস্থা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন তা লিপিবদ্ধও করেছেন। তাদের সেই রচনাবলী কাদিয়ানীদের আসল পরিচয় প্রকাশ করে। তাদের এই হৃদয়নিংড়ানো অনুভূতি প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন। বিশেষ করে কাদিয়ানী ভাইদের বলব, ক্রোধ, ক্ষোভ ও বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে এই দাস্তানগুলো পড়–ন। চিন্তা করুন। সত্য দিলে আল্লাহর কাছে হেদায়েত প্রার্থনা করুন। আল্লাহর অনুগ্রহের সাগর অসীম ও অনন্ত। তিনি অনুগ্রহ করবেন। কিন্তু শর্ত হলো নিজেকে তা পাওয়ার যোগ্য বানাতে হবে। মানুষ যদি সত্যিকারভাবে অনুসন্ধান কওে, তাহলে অবশ্যয়ই গন্তব্যে পৌঁছবে। আল্লাহ তাআলাই সব কিছুর তাওফিক দানকারী।
মুহাম্মদ মতীন খালিদ