ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যকীয় বিশ্বাস হল- শেষ যামানায় ইমাম মাহদী আগমন করবেন। তাঁর হাতে গোটা পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় নিশান উড়বে। গোটা পৃথিবীর বাদশাহী থাকবে তার হাতে। তিঁনি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর হবেন। আজো মুসলমানগণ তাঁর অপেক্ষায় আছেন। তবে তাঁর জন্য ইসলামের কোন বিধান পালন থেমে নেই। মুসলমানদের ঈমান ও আমলও থেমে নেই। ইসলাম ও মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়াদী স্বাভাবিকভাবে চলছে। সাথে সাথে অপেক্ষাও চলছে।

মুসলমানদের এই অপেক্ষার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ইমাম মাহদীর মর্যাদার আসনটি দখল করার অভিলাষ করেছে এবং ইমাম মাহদী হওয়ার মিথ্যা দাবী করেছে। এ যুগে ইমাম মাহদী হওয়ার মিথ্যাদাবীদারদের অন্যতম মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী। তিনি ভারতের পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন। নিজেকে অনেক কিছু দাবী করেন। প্রথমে মুজাদ্দিদ, ইমাম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব দাবী করেন। পরে ছায়ানবী, আংশিক নবী এবং বুরুজী নবী হওয়ার দাবী করেন। আরও পরে শরিয়তধারী পূর্ণ নবী হওয়ার সাহস করেন এবং নিজেকে সকল নবীর সমষ্টি দাবী করেন। আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠনবী, শেষনবী দাবী করে বসেন। এক পর্যায়ে নিজেকে তিনি স্বয়ং মুহাম্মদ রাসূল বলেই দাবী করে বসেন।
তাছাড়া নিজেকে হিন্দুদের শ্রীকৃষ্ণ হওয়ারও দাবী করেছেন। পাশাপাশি নিজেকে ইমাম মাহদী ও ঈসা মাসীহ হওয়ারও দাবী করেছেন।
যদিও আজকাল তার অনুসারীগণÑযারা কাদিয়ানী সম্প্রদায় নামে পরিচিতÑতাকে ইমাম মাহদী বলেই প্রচার করেন। কারণ নবী দাবীর বিষয়টি মুসলমানগণ সহজে মেনে নিতে পারেন না। আর মাহদী হওয়ার কথা বলে সহজ-সরল মানুষকে সহজে ধোঁকা দেওয়া যায়। তাই তার মাহদী হওয়ার দাবীটি আজ কাদিয়ানী সম্প্রদায় জোরেশোরে প্রচার করে।
কিন্তু আসলে কি মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ইমাম মাহদী? বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণাদীর আলোকে এই বিষয়টিই বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে এই রচনায়।

কথা পরিস্কার। ইমাম মাহদীর কথা অসংখ্য হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। উম্মত যাতে বিভ্রান্তির শিকার না হয়, সেজন্য বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে। তাঁর নাম, বংশ ও পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কখন আসবেন, আগমনকালে পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে, আগমনের পর পৃথিবীতে কী কী বিস্ময়কর ঘটনা ঘটবে, তিনি কী কী দায়িত্ব সম্পাদন করবেন এবং তার আগমনে পৃথিবীতে কী কী পরিবর্তন শুরু হবে এসব হাদীছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। এমনকি তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করবেন, কোথায় কিভাবে তাঁর আবির্ভাব ঘটবে, কোথায় কোথায় তিনি গমন করবেন এসবও বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম মাহদী সম্পর্কে যে পরিচয় দেওয়া হয়েছে, তাঁর যে গুণাবলী ও নিদর্শনাবলীর কথা হাদীছে উল্লিখিত হয়েছে তার কোন একটিও মির্যা কাদিয়ানীর মাঝে পাওয়া যায় না। সেগুলোর সাথে তার দূরতম কোন সম্পর্কও নেই। সুতরাং তিনি কিভাবে সেই ইমাম মাহদী হবেন?

তাছাড়া মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ছিলেন অত্যন্ত নিচ স্বভাবে মানুষ। তিনি অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতেন। বিরোধীদের হাজারবার লা’নত দিয়েছেন। মিথ্যাচার করতেন বেধরক। একেক সময় একেক কথা বলতেন। জীবনে কোনদিন হজ করেন নি। মক্কা-মদীনায় পা রাখেন নি। তাহলে এমন একজন মিথ্যাবাদী ব্যক্তি কীভাবে ইমাম মাহদী হবেন?
এ সকল প্রশ্নের উত্তরগুলোই গ্রন্থিত করা হয়েছে ভেতরের পাতা গুলোয়।

আমি এই রচনাটির কাজ শুরু করি ২০১৮ঈং সালের অক্টোবর মাসে একটি দাওয়াতি সফর থেকে ফিরে এসে। সেখানে যে সকল মুসলমান ভাই না বুঝে কাদিয়ানীধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন তাদের কাছে ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, সরলমনা এ সকল মানুষগুলো জানেনই না যে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নবী হওয়ার দাবী করেছিলেন। যদিও নবী হওয়ার দাবী করে মির্যা কাদিয়ানী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সবই তার রচিত বইয়ে আজো সংরক্ষিত আছে। কিন্তু কাদিয়ানীরা সরলমনা এসব মানুষের কাছে তা প্রকাশ করে না।

যাহোক, তাদেরকে বুঝানো হয়েছে তিনি ইমাম মাহদী হওয়ার দাবী করেছেন এবং শুধু মাহদী হিসেবেই তারা মির্যার অনুসারী হয়েছে। কিন্তু মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কীসের ভিত্তিতে মাহদী হওয়ার দাবী করেছেন? মাহদী দাবী করার কী অধিকার তার আছে? এসব বিস্তারিত বিবরণ তখনও আমার জানা ছিল না। সাথে সাথে প্রকৃত ইমাম মাহদী সম্পর্কে হাদীছে যে বিরবরণ, গুণাবলী ও নিদর্শনাবলী বর্ণিত হয়েছে সে সম্পর্কেও আমার জানাশোনার পরিধি ছিল খুবই সীমিত। তখন থেকেই এ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করি এবং নোট নিতে থাকি। শিক্ষকতা ও ইমামমসহ বিভিন্ন দায়-দায়িত্বের পাশাপাশি গত দু’বছরে কিছু পড়াশোনা এবং ছোট ছোট প্রবন্ধ রচনার কাজ করি। অতপর করোনাকালীন সময়ে লম্বা অবসর থাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ রচনার কাজে মনোনিবেশ করি।

এখন রচনাটি পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। এ মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। যারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাই। যদি কারও দৃৃষ্টিতে কোন অসঙ্গতি ধরা পড়ে তাহলে জানানোর অনুরোধ রইল। আল্লাহ তায়ালা সংশ্লিষ্ট সকলেকে কবুল করুন এবং একে বিভ্রান্ত মানুষের হেদায়েতের মশাল বানিয়ে দিন। আমীন।

 

ফয়জুল্লাহ
খতীব, সালামবাগ জামে সমজিদ.
০১.১২.২০ঈং.