ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে অদ্যাবধি চলে আসা ঈমানবিধ্বংসী একটি মতবাদের নাম কাদিয়ানিয়াত বা কাদিয়ানীবাদ। এটি একটি জঘন্য এবং ভয়াবহ কুফুরী ফেতনা। ইসলামের মোকাবেলায় দাঁড় করানো এ মতবাদের অনুসারীদেরকে কাদিয়ানী বলা হয়- তাদের গুরু মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর দিকে সম্বন্ধ করে।
কাদিয়ানীরা নিজেদেরকে শুধু মুসলিম নয়; ‘প্রকৃত মুসলিম’ বলে দাবি করে। আর বিশ্বের সকল মুসলমানকে শুধু মির্যা কাদিয়ানীকে না মানার কারণে কাফের মনে করে। অথচ বহু স্পষ্ট কুফুরী বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের কারণে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী অমুসলিম ও কাফের এবং তার অনুসারীরাও অমুসলিম এবং কাফের। গোটা মুসলিম উম্মাহ্র ঐকমত্য এবং মুসলিম আলিম ও গবেষকবর্গের সর্বসম্মত ফতোয়া ও সিদ্ধান্ত এটিই।
মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কাফের হওয়ার বহু কারণ রয়েছে। তার কুফুরিয়াতের প্রকারও অনেক। একেক প্রকারের অধীনে রয়েছে অসংখ্য উদ্ধৃতি-উদাহরণ। স্বতন্ত্রভাবে বিবেচনা করলে একেকটি উদ্ধৃতিই তার কাফের হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমনকি মির্যার কোনো কোনো বক্তব্য এমনও রয়েছে, যা দেখলে সহজেই বুঝতে পারবেন, তার একেকটা কথা কতগুলো কুফুরির সমষ্টি এবং প্রত্যেকটিই কত মারাত্মক ও ভয়াবহ পর্যায়ের কুফর ধারণ করে রেখেছে। আর এ ধরনের উদ্ধৃতিও সংখ্যায় কম নয়; অনেক।
তবে তন্মধ্যে সবচে নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম কুফর হচ্ছে- মির্যা কাদিয়ানীর নবুওত দাবি। অর্থাৎ ইসলামের অকাট্য এবং অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় প্রাপ্ত ও অনুসৃত মৌলিক আকীদা হল, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী ও রাসূল। আল্লাহ তাআলা তাঁর উপর নবুওত ও রিসালাতের ধারা সমাপ্ত করে দিয়েছেন। কুরআনে কারীমে এবং হাদীস শরীফের মাধ্যমে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানীতে তিনি তা জানিয়ে দিয়েছেন। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী খতমে নবুওতের এ ইসলামী মৌলিক আকীদার উপর হামলে পড়েছে। নিজে নবী ও রাসূল হবার দাবি করেছে, নিজেকে স্বতন্ত্র শরীয়তের অধিকারী সাব্যস্ত করেছে এবং নিজের নবুওতকে সর্বশ্রেষ্ঠ আখ্যা দিয়েছে। অতএব তার নবুওতের মিথ্যা দাবি নিছক নবুওত দাবি নয়; বরং তা অসংখ্য ভয়াবহ কুফুরের এক দীর্ঘ তালিকার শিরোনামমাত্র।
নবুওত ও শরীয়তপ্রাপ্তির মিথ্যা দাবি করে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৯০৮ ঈ.) নিজেকে ‘কাযযাব ও দাজ্জাল’-এর তালিকায় শামিল করেছে, শুধু তাই নয়; বরং এভাবে সে নিজেকে আখেরী নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওত ও শরীয়ত, তাঁর প্রতি অবতীর্ণ সর্বশেষ ওহী আলকুরআনুল কারীমের বিদ্রোহী হিসাবে দাঁড় করিয়েছে। তাকে এবং তার অনুসারীদেরকে যদি তাদের দাবি-দাওয়ার এবং আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিচার করা হয় তাহলে তারা ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধর্মের প্রবক্তা ও অনুসারী। তাই ইসলাম, মুসলিম, মুসলমান, আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খাতামুন নাবিয়্যীন, কুরআন, সুন্নাহ, ইসলামী শরীয়তসহ শাআইরে ইসলাম ও সকল ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার তাদের প্রতারণা বৈ কিছু নয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বানানো এই ‘ধর্ম’ কোনো পুরোনো (আপন যমানায় অনুসরণীয় সত্য) ধর্মের বিকৃত রূপ নয়, কোনো পুরোনো রহিত ধর্মও নয়; বরং এটি সকল ধর্ম ও শরীয়তকে রহিতকারী এবং নতুন ও পুরাতন সকল ইজম (সুন্নাতুল জাহিলিয়্যাহ)-কে বাতিলকারী কুরআনী শরীয়ত আবির্ভাবের তেরশ বছর পরের বানানো ও দাবিকৃত ধর্ম; যার একমাত্র ভিত্তিই হচ্ছে নবুওত ও শরীয়তের মিথ্যা দাবি; আখেরী ওহী, আখেরী নবী ও আখেরী শরীয়তের বিদ্রোহ এবং কুরআন ও সুন্নাহ, ইসলাম ও ইসলামী শরীয়তের আকাইদ ও পরিভাষা বিকৃতির উপর। তাই কাদিয়ানিয়াত কোনো সাধারণ বিদআতী ফিরকা নয়, আর নয় আহলে কিতাবের মতো কোনো রহিত দ্বীনের অধিকারী; এটি ইসলামের নিছক বিদ্রোহ এবং খালেছ ইরতিদাদ ও যানদাকা।১ এই প্রবন্ধে আমরা তাদের মতাদর্শ, কুফুরী বক্তব্য ও আকীদা-বিশ্বাসের সব দিক নিয়ে আলোচনা করব না; শুধু মির্যা গোলাম কাদিয়ানীর নবুওতের মিথ্যা দাবির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।
এই একটি বিষয়ও যদি জানা থাকে, তাহলেও মির্যা সাহেব ও তার অনুসারীদের হাকীকত বুঝতে কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না। তাদের অন্যান্য কুফুরী আকীদা-বিশ্বাস এবং কুফুরী কর্মকাণ্ডের বিষয়টি তো আছেই।২
ঊনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ানে জন্ম নেওয়া মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। তৎকালীন উপনিবেশী বৃটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সে তার কুফরিয়াত নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে এবং বিভিন্ন পলিসিতে সরলমনা মুসলমানদের ঈমান হরণে লিপ্ত হয়।