১৮৮০ সন থেকে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হয়। তবে শুরুতেই সে সরাসরি নবুওত দাবির ধৃষ্টতা দেখানোর দুঃসাহস করেনি। সে ধারাবাহিকভাবে একেক সময় একেক উপাধির অধিকারী বলে ঘোষণা দিতে থাকে। ১৮৮০ সনে সর্বপ্রথম সে নিজেকে ‘মুজাদ্দিদ’ (ধর্মীয় সংস্কারক) বলে দাবি করে। তারপর কখনো ‘মুলহাম মিনাল্লাহ’ (আল্লাহর তরফ থেকে ইলহামপ্রাপ্ত), কখনো ‘মামুর মিনাল্লাহ’ (আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট), কখনো ‘মুহাদ্দাস’ (যার সাথে গায়েব থেকে কথা হয়), কখনো ‘নাযীর’ (সতর্ককারী), কখনো ‘ইমামুয যামান’ বা যামানার ইমাম ইত্যাদি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপাধির অধিকারী বলে সে দাবি করতে থাকে।

১৮৮৯ সনে এসে সে স্বতন্ত্র জামাত প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজের দিকে সম্বন্ধ করে এ দলের নামকরণ করে ‘জামাতে আহমদিয়া’। এ হিসাবে কাদিয়ানীরা ‘আহমদী’ বলে নিজেদের পরিচয় দেয়।

১৮৯১ সনে এসে সে নিজেকে ‘মসীহে মাওঊদ’ (প্রতিশ্রুত মাসীহ) ঘোষণা দেয়৩ এবং ‘ইমাম মাহদী’ বলে দাবি করে। অবশেষে ১৯০০/১৯০১ সনে এসে কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই সে নিজেকে পরিপূর্ণ নবী বলে ঘোষণা দেয়। মৃত্যু (১৯০৮ ঈ.) অবধি সে এ দাবির উপরই অনড় থাকে। আর তার অনুসারীরা তাকে এমনটাই বিশ্বাস করে।

এ হল মির্যা কাদিয়ানীর নবুওত দাবির সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট।

তবে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার চক্করে ফেলে (যেমন মাসীহ, মাহদী, মুজাদ্দেদ, মুলহাম, মামুর ইত্যাদি) সাধারণ মানুষ থেকে নবুওত দাবির প্রসঙ্গটি চেপে যাওয়া মূলত ধোঁকা এবং প্রতারণামাত্র।

মির্যা কাদিয়ানীর দাবি অনুযায়ী-

ক. সে নবী এবং রাসূল।

খ. তার উপর ওহী অবতীর্ণ হয়েছে।

গ. সে স্বতন্ত্র শরীয়তের অধিকারী।

ঘ. তার মাধ্যমে মুজিযা প্রকাশিত হয়েছে।

ঙ. তার নিকট হযরত জিবরীল আ. আগমন করতেন।

চ. ফিরিশতাগণ ওহী নিয়ে তার নিকট আসতেন।

ছ. সে তার দাবিকৃত ওহীকে কুরআন মাজীদের ন্যায় অকাট্য ঘোষণা করেছে।

জ. তার অস্বীকারকারীদেরকে সে কাফের ঘোষণা করেছে।

ঝ. আর যে একবার তাকে মানার পর তাকে প্রত্যাখ্যান করে পুনরায় ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছে সে তাকে মুরতাদ (ধর্মান্তরিত বা ধর্মত্যাগী) আখ্যা দিয়েছে। [দ্রষ্টব্য : হাকীকতুল ওহী, লেখক, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, পৃ. ১২৪; রূহানী খাযায়েন ২২/১২৭; হাকীকতুল ওহী (বাংলা), পৃ. ৯৪]

অর্থাৎ নবুওত দাবির পাশাপাশি সে নবুওত-রিসালাত সংশ্লিষ্ট অনিবার্য অনুষঙ্গ ও পরিভাষাগুলো নিজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে এবং একমাত্র নবী ও রাসূলের সাথেই সম্পৃক্ত ও সীমাবদ্ধ বৈশিষ্ট্যাবলির অধিকারী বলে সে নিজের ব্যাপারে ঘোষণা করেছে।

তার ও তার সম্প্রদায়ের আরো ধৃষ্টতা হল, কাদিয়ানী ধর্মের বিশ্বাস মতে- মির্যা যেহেতু নবী, তাই মির্যার পরিবার হচ্ছে নবী-পরিবার। তার বিবি নুসরত জাহান বেগম ‘উম্মুল মুমিনীন’। তাকে যারা দেখেছে এবং তার বাইয়াত গ্রহণ করেছে তারা সাহাবী। কাদিয়ানের জলসা হজে¦র সমতুল্য। মির্যা কাদিয়ানীর মৃত্যুর পর কাদিয়ানী জামাতে খলীফা হওয়ার যে ধারা রয়েছে তা আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর খুলাফায়ে রাশেদীনের খেলাফত লাভ করার সদৃশ ইত্যাদি। এ হিসাবে কাদিয়ানীরা তাদের প্রথম খলীফা হাকীম নুরুদ্দীনকে ইসলামের প্রথম খলীফা আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রা.-এর সদৃশ সাব্যস্ত করেছে। এজাতীয় জঘন্য জঘন্য আকীদা তারা লালন করে। [দ্রষ্টব্য : সীরাতুল মাহদী ২/১১৭, খুতবায়ে ইলহামিয়া, পৃ. ১৭১, রূহানী খাযায়েন ১৬/২৫৮, ২৫৯; খুতবায়ে মাহমুদ ৪/২৫৪; হযরত মৌলভী নূরউদ্দীন (রা.) খলীফাতুল মসীহ আউয়াল, লেখক, মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান (কাদিয়ানী), বাংলা, পৃ. ১১]

প্রকাশ থাকে যে, কাদিয়ানী সম্প্রদায় মির্যা কাদিয়ানীর ক্ষেত্রে এধরনের ভয়াবহ এবং মারাত্মক আকীদাসমূহ পোষণ করার কারণ হল, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়নীকে তারা আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমকক্ষ-সমতুল্য এবং বরাবর, এমনকি তার চেয়েও বেশি কিছু বিশ্বাস করে থাকে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুবারক শানে এটা জঘন্য ধৃষ্টতা এবং চরম বেয়াদবি। ইসলামের অকাট্য মৌলিক আকীদা খতমে নবুওতের উপর কুঠারাঘাত এবং ইসলামকে সমূলে ধসিয়ে দেবার গভীর ষড়যন্ত্র।

খতমে নবুওতের আকীদার উপর পুরো দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যুগে যুগে ঈমান হরণকারী গোষ্ঠী খতমে নবুওতের এ চাদরে আঁচড় বসাতে এবং ছলেবলে উম্মতকে কুফর ও বেঈমানীর ফাঁদে টেনে নিতে অপচেষ্টা চালাবে। তাই নবীজী উম্মতকে অগ্রিম সতর্ক করে দিয়েছেন। নবীজী বলেন-

لاَ تَقُومُ السّاعَةُ حَتّى يُبْعَثَ دَجّالُونَ كَذّابُونَ قَرِيبٌ مِنْ ثَلاَثِينَ، كُلّهُمْ يَزْعُمُ أَنّهُ رَسُولُ اللهِ.

ততদিন কিয়ামত হবে না, যতদিন না ত্রিশের মতো কাযযাব ও দাজ্জাল আবির্ভূত হয়। তাদের সকলেই দাবি করবে, সে আল্লাহর রাসুল। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৪৪৯; সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৬০৯, ৭১২১

নবীজী আরো বলেন-

إِنّهُ سَيَكُونُ فِي أُمّتِي كَذّابُونَ ثَلَاثُونَ كُلّهُمْ يَزْعُمُ أَنّهُ نَبِيّ، وَأَنَا خَاتَمُ النّبِيِّينَ لَا نَبِيّ بَعْدِي.

অচিরেই আমার উম্মতের মাঝে ত্রিশজন মিথ্যুক আবির্ভূত হবে। প্রত্যেকেই দাবি করবে সে নবী। অথচ আমি শেষ নবী। আমার পর কেউ নবী হবে না। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৩৯৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫২; জামে তিরমিযী, হাদীস ২২১৯

লক্ষণীয় বিষয় হল, নবীজী নবুওতের মিথ্যা দাবিদারের ক্ষেত্রে ‘কাযযাব ও দাজ্জাল’ দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। যা অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে। কাযযাব মানে মহা মিথ্যাবাদী আর দাজ্জাল মানে মহা প্রতারক এবং ভয়াবহ ধোঁকাবাজ। অর্থাৎ ধোঁকা, প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তারা এমনভাবে নবুওতের দাবি করবে যে, অনেকেই পেরেশানীতে পড়ে যাবে। তারা স্পষ্টভাবে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা করবে না। ব্যাখ্যার নামে নানা অপব্যাখ্যা দাঁড় করাবে। ফলে সরলমনা মুসলমান চরমভাবে প্রতারিত হবে। তাদের খপ্পর থেকে সহজে পরিত্রাণ লাভের জন্য নবীজী মূল উসূল স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর তা হল- ‘আমিই শেষ নবী। আমার পর আর কোনো নবী নেই।’ অতএব আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর যে-ই নবী হবার দাবি করুক না কেন এবং যেভাবেই দাবি করুক না কেন- তাকে প্রত্যাখ্যান করার মাঝেই ঈমানের হেফাযত হবে।

মির্যা কাদিয়ানীর বক্তব্য-বিবৃতি এবং কাদিয়ানী মতবাদ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্ক করে দেওয়া ‘কাযিব’ ও ‘দাজ্ল’ তথা মিথ্যা ও প্রতারণার এক ভয়াবহ রূপ। মির্যা কাদিয়ানী কেবল নবুওতের মিথ্যা দাবি করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তার বক্তব্যে রয়েছে অনেক রকমের ‘দাজ্ল’। সে প্রকাশ্যে ইসলামের মোকাবেলায় বিদ্রোহে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ধোঁকা প্রতারণা ও ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু শত দাজ্ল ও প্রতারণা করেও সে তার কুফরী দাবিগুলো ঢাকতে পারেনি।

মির্যা কর্তৃক খতমে নবুওত অস্বীকার এবং নবুওতের মিথ্যা দাবির বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট। এতে কোনো ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। কিন্তু তবুও কাদিয়ানীরা এক্ষেত্রে অপব্যাখ্যা এবং প্রতারণার আশ্রয় নেয়, যা পরিষ্কার দাজল, নিফাক এবং যানদাকা। সাধারণ কুফর অপেক্ষা যা আরো ভয়াবহ। তার উদ্ধৃতিগুলো লক্ষ্য করলে পাঠক এর স্পষ্ট মহড়া দেখতে পাবেন।

মোটকথা, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নবুওত এবং নবুওত ও রিসালাতের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যাবলী ধারণের ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ নিজেকে নবীর আসনে নিয়ে নবুওত সংশ্লিষ্ট যত লকব ও পরিভাষা রয়েছে সবগুলো সে নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে আর তার অনুসারীরাও তাকে ঐ পর্যায়ে রেখেই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে আসছে। তার স্বলিখিত পুস্তকগুলোতে এর উদাহরণ প্রচুর। তেমনিভাবে কাদিয়ানীদের অথরিটিমূলক বক্তব্য-বিবৃতিতেও এর অনেক নমুনা ও উদাহরণ রয়েছে।

মির্যা কাদিয়ানী ও তার অনুসারীরা কোথাও কোথাও বিষয়টি ইশারা ইঙ্গিতে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেছে, আবার কখনো কখনো স্পষ্টভাবেই বলে ফেলেছে।

বিষয়টি যাতে সহজেই বোধগম্য হয় তাই আমরা এখানে কয়েকটি ছরীহ ও সুস্পষ্ট উদ্ধৃতি (নকলে কুফর কুফর না বাশাদ-এর ভিত্তিতে) তুলে ধরব- ইনশাআল্লাহ।

যদিও তাদের ইঙ্গিতার্থমূলক পেঁচানো বক্তব্যগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বক্তব্য অপেক্ষা আরো অধিক জটিল ও ভয়াবহ হয়ে থাকে।