ভূমিকা
খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে আমাদের এ ভারত উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের আগমন এবং বণিকের বেশে ধীরে ধীরে এখানকার শাসনক্ষমতায় আরোহণ, অতঃপর পর্যায়ক্রমে এ মাটির বুক থেকে ইসলামের নাম চিরতরে মুছে ফেলার হীন লক্ষ্যে তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও চক্রান্তের ইতিহাস কমবেশী প্রায় সব শিক্ষিতজনেরই জানা আছে। উপমহাদেশের ইতিহাসের এ এক বেদনাদায়ক অধ্যায়, যা লিখিত হয়েছে মুসলমানদের তাজা রক্তে।
সুদীর্ঘ প্রায় দুইশ বছর তারা এই উপমহাদেশ শাসন করেছে। ইতিহাস সাক্ষী- ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য তারা অনেক মসজিদ-মাদরাসা গুড়িয়ে দিয়েছে। শহীদ করেছে শত শত আলেমেদ্বীনকে। তাদের পাশবিক নির্যাতনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে মানবতা হয়ে পড়েছিল বিধ্বস্ত, বাকরুদ্ধ এবং চরম অসহায়। মুসলমানদের প্রতি সীমাহীন অত্যাচার ও অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে তারা এ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান ও সাম্রাজ্যের ভিতকে দৃঢ় ও পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় তাদের সে জুলুমের বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।
এ দীর্ঘ সময়ে তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রতিরোধ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। কখনও তার আত্নপ্রকাশ ঘটেছে ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ নামে; যার নেতৃত্বে ছিলেন পূর্ববাংলার হাজ্বী শরীয়তুল্লাহ রাহ.। কখনও তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন পশ্চিমবাংলার মাওলানা নেছার আলী ওরফে ‘তিতুমীর’ রাহ.। যে তিতুমীরের ‘বাঁশের কেল্লা’-র কথা আমরা সকলেই জানি। এরূপ আরও অনেক সংগ্রামী সাধক এ পথে নিজের জীবনোৎসর্গ করেছেন। যাদের অবিরাম সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কারণেই বৃটিশ বেনিয়ারা এ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
ইতিহাস সাক্ষী, এই ভূখণ্ডে স্বাধীনতা লুট করার জন্য এবং মুসলমানদের প্রতিরোধ-আন্দোলনকে দমন করার জন্য ইংরেজরা মীর জাফর ও মীর সাদেকের ন্যায় অনেক বিশ্বাসঘাতককে ব্যবহার করেছে। যারা নিজ জাতি ও ধর্মের সাথে গাদ্দারী করে ইংরেজ বেনিয়াদের সহোযোগিতা করে। ফলে ভারতবর্ষে তাদের আগ্রাসন ও স্বেচ্ছাচারিতার শিকড় দৃঢ় ও মজবুত হয়ে যায়।
এতকিছুর পরও যখন তাদের বিরূদ্ধে ক্ষণেক্ষণে প্রতিরোধ আন্দোলন চলতেই থাকে এবং ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে মুসলমানদের বুকের ভেতরের দীর্ঘদিনের ছাইচাপা আগুনের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তখন তারা আন্দোলনের এ ধারা চিরতরে বন্ধ করার জন্য নতুন এক জঘন্য কৌশল বেছে নেয়। তারা ভেবে দেখল, ভারতবর্ষের মুসলমানরা অত্যন্ত ধর্মভীরু। আল্লাহ ও রাসূলের কথার সামনে তারা সবকিছু বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। তারা মানলে শুধু তাদের নবীর কথাই মানে। কারণ, নবীদের মুখের কথা সাধারণ কথা নয়; তা স্বয়ং খোদার তরফ থেকে আগত ওহী। আর ওহীর নির্দেশ পালন মুসলমানদের দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ ফরয বিধান। অতএব, যদি কাউকে ব্যবহার করে ওহীর দোহাই দিয়ে ইংরেজদের পক্ষে কথা বলানো যায় এবং মুসলমানদেরকে বৃটিশ শাসনের আনুগত্যের দীক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে জনসাধারণের মনের বৃটিশবিদ্বেষ কিছুটা লঘু করা সম্ভব হতে পারে।
এ নীলনকশা বাস্তবায়নে তারা নির্বাচন করল পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাশপুর জেলার কাদিয়ান নামক গ্রামের এক ব্যক্তিকে। যার নাম মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী। যে ব্যক্তি ইংরেজদের ছত্রছায়ায় তাদের হীন স্বার্থ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নবুওতের দাবি করে। অথচ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই শেষ নবী। তাঁর পরে কোনো ব্যক্তি নবুওতের আসনে অধিষ্ঠিত হবে না। তাঁর পরে যে কোনো ধরনের নবুওতের দাবিদার নিঃসন্দেহে কাফের ও বেঈমান। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আর কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে সকল যুগের মুসলিম উম্মাহর আকীদা-বিশ্বাস এটাই ।